লেখক ও সাংবাদিক- 'এবিএম সোলায়মান'
আসছে ১৪ই জানুয়ারি ২০২৪ইং রোজ রবিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ময়মনসিংহ বিভাগের, ফুলবাড়িয়া উপজেলার, বড়ইআটা গ্রামে ২৬৫ তম ঐতিহ্যবাহী গুম ঘুটিখেলা। তথ্যসূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসন আমলে ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার তৎকালীন জমিদার 'রাজা শশীকান্ত'। ত্রিশাল উপজেলার বৈলরের জমিদার, 'হেমচন্দ্র রায়' তাদের মধ্যে জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিদার আমলের শুরু থেকেই জমির পরিমাপ ছিল কাঠা প্রতি দশ শতাংশ। পরগনা প্রতি কাঠা হিসেব করা হত সাড়ে ছয় শতাংশে। জমিদারি এই দুই নীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে তুমুল আন্দোলন। জমির বিরোধ মীমাংসা কল্পে 'বড়ইআটা' গ্রামের তালুক-পরগনা সীমানায় এই ঘুটি খেলার আয়োজন করা হয়। ঘুটি খেলার শর্ত ছিল, ঘুটি খেলা যাদের সীমানা দিকে বেশি নিয়ে গুম করতে পারবে তারা হবেন 'তালুক'। এবং পরাজিত দল হবে পরগনা। সেবারের মত মুক্তাগাছার জমিদার বিজয়ী হন এবং তাদের সীমানা আওতাভূক্ত স্থানকে তালুক নামে নামকরণ করা হয়। তবে হার জিত থাকলেও খেলা থেকে ওঠে আসা জনমনে যে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছে সেটি কিন্তু থেমে থাকেনি? আজো অব্দি লালন করে ধারণ করে আসছে সেখানকার মানুষ।
খেলাটির সঠিক তারিখ নির্ধারণ করা হয় বাংলা সাল হিসেব করে। পৌর্ষের শেষ দিন হচ্ছে খেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার নির্ধারিত তারিখ। শীতের আগমনি বার্তার সাথে সেখানকার মানুষের মনে বয়ে আনে ঘুটি খেলার আনন্দ। কেউ কেউ আরো আগে থেকেই দিন গুনতে থাকে খেলার নির্দিষ্ট ক্ষণের। ফুলবাড়িয়া উপজেলার লক্ষিপুর, বড়ইআটা, বাটিপাড়া, বালাশ্বর, চরকালিবাজাইল, তেলিগ্রাম, সাড়ুটিয়া, ইচাইল, কাতলাসেন সহ আশেপাশের অন্তত ১৫-২০ টি গ্রামের মানুষদের মনে চলে বৎসর প্রতিক্ষণ দিনটির অপেক্ষা। ঘরে ঘরে চলে নতুন আমন ধানের পিঠা-পুলির উৎসব। সেইখানকার মানুষদের আঞ্চলিক কিছু পিঠা হচ্ছে, নুন-মরিচের পিঠা, গুটা পিঠা, তেলের পিঠা, দুধ চিতই পিঠা, কলার পিঠা।
উল্লেখ্য, গ্রাম গুলোতে খেলার কয়েকদিন আগেই আসতে থাকে দূরদূরান্তের আত্নীয়স্বজন এবং দূরে কোথাও কর্মরত সেখানকার মানুষেরা। জবাই দেওয়া হয় অসংখ্য গরু-ছাগল।
শুরু থেকে খেলাটি দুইটি দল নিয়ে যাত্রা হলেও এখন দাঁড়িয়েছে চারটি দলে। অথাৎ খেলা শুরুর মেইন পয়েন্ট থেকে চারদিক(উত্তর, দক্ষিন, পূর্ব,পশ্চিম) চারটি দল হিসেব করা হয়। খেলা শুরুর নির্দিষ্ট সময় বিকেল চারটা হলেও যোহরের সময় থেকেই ছুটে আসে বিভিন্ন জায়গায় থেকে মানুষ। বিশেষ করে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কয়েক ঘণ্টা পূর্বেই সেখানে উপস্থিত হন।
পিতল দিয়ে তৈরি সম্পূর্ণ গোলাকার নয়, কমলালেবু আকৃতি বস্তুটির ওজন আনুমানিক ২০-২৫ কেজি হবে। বিকেল চারটা বাজার পূর্বেই সেই জায়গাতে ঘুটি উপস্থিত করা হয়। খেলা শুরু কালে ছোটছোট ছেলেমেয়েরা কাছে যেতে পারবেনা তাই যেসব ছেলেমেয়েরা অধির আগ্রহ নিয়ে অনেক আগেই ছুটে আসে, তাদেরকে দেখতে দেওয়া হয়। প্রথমে খেলা পরিচালনা কমিটিবিন্দু, লক্ষিপুর, বড়আটা গ্রামের কিছু ইয়াং যুবকেরা নিজেরা নিজেরাই খেলতে থাকে। যেহেতু তারা সেই স্থানেরই। তাই তারা নিরপেক্ষ ভূমিকা রেখে কিছুটা সময় কেন্দ্রেই ঘুটি রাখতে চেষ্টা করেন। তারপর যখন চারদিক থেকে দলে দলে খেলোয়াড়রা আসতে থাকে তাদের হাতে খেলাটি ছেড়ে দেন।
পিতলের বস্তুটিকে মাঝখানে রেখে চারদিক থেকে আসা খেলোয়াড়রা পর্যায়ক্রমে খেলতে থাকে। অনেকটা কেড়ে নেওয়ার মত। তবে এই কাড়াকাড়ি হয় লক্ষ মানুষের ভিড়ে চেনা অচেনা মানুষের মাঝে। এই জন্য কোন খেলোয়াড়কে নির্দিষ্ট কেন দল থেকে পুরুষ্কৃত করা হয়না। যার যার অবস্থান থেকে স্ব ইচ্ছায় খেলায় অংশ গ্রহণ করে থাকে।
তবে খেলাটিতে একটি বিষয় স্পষ্ট ফুটে ওঠে। সেটি হচ্ছে, জন্মভূমির প্রতি অগাধ ভালবাসা। কারণ যারা খেলায় অংশগ্রহণ করে তাদের মাঝে এই বোধটা কাজ করে যে, আমার দিকটাকে জিতাতে হবে। ঘুটিটি যেইদিকে এসে গুম হবে সেই বছর সেই দিকের মানুষেরাই বিজয়ী হবে। খেলা শেষে সবার মুখে একই কথা শুনা যায়, ঘুটি কোন দিকে গেল?
খেলা শুরু হওয়ার পর থেকে নির্দিষ্ট কোন সময়সীমা বাঁধা থাকেনা। শোনা যায়, কোন কোন বছর নাকি সারারাত খেলা চলছে। তাই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা রাত্রি হওয়ার আগেই বাড়ি চলে আসে এবং ঘুমিয়ে পড়ে। তার পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে চোখ ঘসতে ঘসতে বাবা-মায়ের কাছে জিজ্ঞেসা করে ঘুটি কোন দিকে গেছে?
খেলাটি খেলতে হয় গাঁয়ের শক্তি দিয়ে। তাই এই খেলায় কোন দূর্বল বা ছোট ছোট শিশুরা অংশ গ্রহণ করতে পারেনা। কেননা ঘুটিকে কেন্দ্র করে চারদিক থেকে যখন শতশত হাজার হাজার মানুষ চাপ দেয় সেই সময় কোন দূর্বল বা ছোট শিশুরা থাকলে মৃত্যু হতে পারে। তাই তারা খেলার স্থান থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করেন। খেলা চলাকালীন সময় প্রতিটি দিক থেকে একটি করে বিশেষ নিশানা থাকে। তাতে করে খেলোয়াড়রা সহজেই তাদের দিক চিনতে পারে। সে অনুযায়ী ঘুটিকে সেদিকে ঠেলে নেওয়ার চেষ্টা করে। খেলোয়াড়দের মনকে উৎফুল্ল রাখার জন্য ঢোল, সানাইয়েরও ব্যবস্থা থাকে। বাদ্যের তালে তালে একসাথে জড়ো হয়ে হাত তালি দিতে দিতে সবার মধ্যে একজন ডাক ভাঙ্গে, জিতই আমাদের রে.....(সবাই একি স্বরে ডিও.....।) ঘুডি..... নিল...... গা....রে.... (সবাই একি স্বরে ডিও.....।) বলতে বলতে ঘুটির ওপড় ঝাঁপিয়ে পড়ে। যতক্ষন না ক্লান্ত হয় ততক্ষন ঠেলতে থাকে। এভাবে ঠেলতে ঠেলতে সেই দলটি বেড়িয়ে আসে। আবার অন্য দল একি ভাবে যার আবার বেড়িয়ে আসে। প্রতিটি দিক থেকে এভাবে করেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলা চলতে থাকে। আর চারদিক থেকে ঘিরে ধরা লোকজন খেলাটিকে উপভোগ করতে থাকে।
খেলতে খেলতে সন্ধা গনিয়ে যখন রাত্রি নামে তখন খেলার পরিবেশ হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্রামের মেঠো পথ। বিশাল বড় বিল নাম 'ইচাইল বিল'। তারি পাশের একটি বন্দে খেলা আরম্ভ হয়। কোন কোন সময় সেই বিলের মাঝখানেও চলে যায় খেলাটি। কোন বিদ্যুৎতের ব্যবস্থা নেই। তাই বলে কি খেলা বন্ধ থাকবে? কিছুতেই না। খেলা দেখতে আসা হাজার হাজার মানুষের মাঝে অনেকেই টর্চ লাইট নিয়ে আসে। খেলাকে ঘিরে নিজ নিজ দিকের লোকেরা একসাথে সাড়ি বদ্ধভাবে অবস্থান নেয়। তাদের দলকে সাহায্য করার জন্য টর্চ লাইট জ্বালিয়ে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে ইশারা করতে থাকে। সেই সাথে লাইট ওয়ালাদের সংখ্যা ক্রমে ক্রমে বাড়তে থাকে। সেখানকার জায়গাটি রূপ নেয় বর্ণিল সাজে। দূর থেকে দেখে যেন মনে হয় আকাশের অসংখ্য তারকারাজি একসাথে হয়ে আলোর খেলা খেলছে। সেইসব টর্চলাইটের আলো খেলোয়াড়দের মনে এনে দেয় বিজয়ের হাতছানি। লাইটের হাতছানি আর ঢোলের তালে তালে শরীর ধুলিয়ে ধুলিয়ে উপভোগ করে একটি বছর পরে ঘুরে আসা সেই খেলাটিকে। সবার মনে প্রত্যাশা থাকে খেলাটি যেন খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে না যায়। যার যার অবস্থান থেকে দীর্ঘসময় আকড়ে ধরে রাখতে।
এবিএম সোলায়মান-
সাব-এডিটর ও কলামিস্ট 'দৈনিক উন্নয়ন চিন্তা'